বাড়ি বাণিজ্য শেয়ারবাজারে জালিয়াতি, হচ্ছে আরও ১২ মামলা

শেয়ারবাজারে জালিয়াতি, হচ্ছে আরও ১২ মামলা

মার্জিন ঋণের নীতিমালার বরখেলাপ করে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আর্থসাতের ঘটনায় আরও ১২ মামলা করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার এসব মামলা করতে পারে সংস্থাটি। দুদক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এতে আসামি করা হতে পারে ১৫ জনকে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর রমনা থানায় এ-সংক্রান্ত একটি মামলা করেছেন দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। মামলায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ৫ কর্মকর্তাসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।

শেয়ারবাজারে জালিয়াতির এ ঘটনায় ৬৫ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। মোট ১৩টি ঘটনায় ১৩টি মামলা অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।

দুদক সূত্র জানায়, ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে শেয়ারবাজারে উল্লম্ফনের সময় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইসিবি সিকিউরিটিজ ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের (আইএসটিসিএল) কিছু কর্মকর্তা গ্রাহককে অনিয়মের মাধ্যমে লেনদেনের সুযোগ করে দিয়ে এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। দুদকের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত বছরের শেষ দিকে এ-সংক্রান্ত অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।

সূত্র আরও জানায়, অনুসন্ধান শুরু করার পরও অকাট্য প্রমাণের অভাবে জালিয়াতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ অনুসন্ধানে আইসিবির বেশ কিছু কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ৬৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য বলেন, অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে মামলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মামলার অনুসন্ধানের তথ্য উদ্ধৃত করে দুদকের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র বলেছে, বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাবের মালিকদের মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে শেয়ার কেনার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডেবিট স্থিতির ওপর টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

এতে আরও বলা হয়, ২০০৯-এর শেষের দিকে শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে ক্রমাগত বাড়তে থাকে। অতি মুনাফার লোভে গ্রাহক ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় নেগেটিভ পারচেজ থাকা সত্ত্বেও বিও হিসাবধারী তাঁর অ্যাকাউন্টের সীমার বাইরে ব্যাপক অনিয়ম ঘটিয়ে সরকারি অর্থে অস্বাভাবিক ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনেন। পরে শেয়ারের দর পড়ে যাওয়ায় সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়।

দুদক বলেছে, বিও হিসাব এবং আইসিবি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট হিসাবে মার্জিন ঋণের সীমা অতিক্রম করে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ হিসাবধারীকে আইএসটিসিএলের কর্মকর্তারা সুবিধা দিয়েছেন। এসব কর্মকর্তা প্রতিদিন লেনদেন শেষে গ্রাহক হিসাবের শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় আদেশ অনুযায়ী যথাযথ আছে কি না, তা নিশ্চিত না করে জেনেশুনে অসৎ উদ্দেশ্যে নিজেরা লাভবান হয়ে অনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন।
মামলায় এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণার মাধ্যমে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করে সরকারি অর্থের ক্ষতি সাধন করে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মার্জিন ঋণের অনিয়ম ঘটিয়ে গ্রাহককে তাঁর অ্যাকাউন্টে নিয়মবহির্ভূত লেনদেন করার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার দায়ের করা প্রথম মামলার আসামিরা হলেন আইসিবির সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) টিপু সুলতান ফারাজি, তিন সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. এহিয়া মণ্ডল, মো. সামছুল আলম আকন্দ ও শরিকুল আনাম, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ধনঞ্জয় কুমার মজুমদার এবং আইএফআইসি ব্যাংকের পল্লবী শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সামাদ। তাঁদের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯০৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে টিপু সুলতান ফারাজি, মো. এহিয়া মণ্ডল ও মো. আবদুস সামাদকে মামলার পরপরই সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, জনৈক আবদুস সামাদ ২০০৪ সালে আইসিবিতে একটি বিও হিসাব খোলেন। আইএফআইসি ব্যাংকে মতিঝিল শাখায় তাঁর একটি হিসাব ছিল। ওই হিসাবে প্রচুর লেনদেন থাকলেও ২০০৮ সালে ওই বিও হিসাবের মালিককে মার্জিন ঋণের সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে শেয়ার কেনার করার সুযোগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডেবিট স্থিতির ওপর টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় হিসাবধারীকে।

দুদক আরও জানায়, নতুন ১২ মামলায় মোট আসামি হচ্ছেন ১৫ জন। বৃহস্পতিবার করা মামলায় আইসিবির যে ৫ কর্মকর্তা আসামি হয়েছেন তাঁদের সবাই ১২ মামলাতেই আসামি থাকছেন। সূত্রমতে, তাঁদের সবাই ওই সব ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অন্য ১০ জন আসামির মধ্যে ব্যাংকার, আইসিবির কর্মকর্তাও থাকছেন।

গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন কারাগারে

বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া আইসিবির সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) টিপু সুলতান ফারাজি, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. এহিয়া মণ্ডল ও আইএফআইসি ব্যাংকের পল্লবী শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সামাদকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আদালত সূত্র জানায়, এই তিনজনকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁদের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। আদালতে তাঁরা বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। তাঁরা কোনো অপরাধ করেননি। দুদক ডেকে নিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করেছে। অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।