বাড়ি ক্রিকেট নিজেই বললেন সেই গল্পটাঃ তামিম

নিজেই বললেন সেই গল্পটাঃ তামিম

তামিম ইকবাল এশিয়া কাপ খেলতেই এসেছিলেন অনেক জটিলতা পেরিয়ে। ভিসা সমস্যা, ডান হাতে চোট। মাঠে নেমেই চোট পেলেন অন্য হাতে। ছিটকে গেলেন এশিয়া কাপ থেকে। কিন্তু আর একটা বল খেলা নিয়তিতেই ছিল তাঁর।

হতাশায় মুষড়ে পড়েছিলেন তামিম। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে হাতে চোট পেয়ে মাঠ থেকে ড্রেসিংরুম, সেখান থেকে সোজা হাসপাতাল। হাসপাতালে গিয়ে স্ক্যান করার পর জানা গেল, তামিমের এশিয়া কাপ শেষ! জীবনের সেরা ফর্মে আছেন। সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তিন ম্যাচের দুটিতে সেঞ্চুরি, আরেকটিতে ফিফটি করেছেন। এই ফর্ম নিয়ে এশিয়া কাপ খেলা হবে না! নিজের চেয়েও তামিমের বেশি খারাপ লাগছিল দলের জন্য।

‘মনটা প্রচণ্ড খারাপ। কতটা, তা বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার অনেক আশা ছিল এই টুর্নামেন্ট নিয়ে। উইকেট ব্যাটিংয়ের জন্য অসাধারণ। সেটাও না হয় বাদ দিন। আমি এত ভালো অবস্থায় ছিলাম, এখানে এত বড় একটা ইভেন্ট খেলতে এলাম…কিন্তু কিছুই করা হলো না!’—সেই সময়ের অনুভূতি নিয়ে বলছিলেন তামিম।

সেই খারাপ লাগা আরও বাড়ল, যখন হাসপাতাল থেকে ফিরে দেখলেন, দল আরও বিপন্ন। তাঁর হাতের মতোই ভেঙে পড়ছে দলের মেরুদণ্ড। এভাবে এশিয়া কাপ শুরু করতে চায়নি বাংলাদেশ। কিছুতেই না। স্লিংয়ে হাত ঝুলিয়ে মুখ ভার নিয়ে তামিম ড্রেসিংরুমে ইতস্তত ঘুরছেন। ফিজিওর কড়া নিষেধ, এই অবস্থায় তামিম যেন সামান্য দৌড়ও না দেন। চুপটি করে বসে থাকেন।

প্রথমে মাশরাফিই বললেন কথাটা। তামিমকে কাছে ডেকে অধিনায়ক বললেন, ‘যদি মোস্তাফিজ আউট হয়ে যায় আর মুশফিক উইকেটে থাকে, তাহলে তুই আবার যাস।’ তামিম প্রথমে ভাবলেন, মাশরাফি হয়তো কৌতুক করছেন। এমন দুষ্টুমি মাশরাফি অনেক সময়ই করেন। কিন্তু মাশরাফির পরের কথায় বুঝে গেলেন, অধিনায়ক সত্যি সত্যিই ভাবছিলেন এই বিকল্প। যে ভাবনা থেকে অধিনায়ক নিজে সরে আসতে চান।

পরিকল্পনা ছিল এমন, যদি শেষ ওভার পর্যন্ত মুশফিক অপরাজিত থেকে স্ট্রাইকিং প্রান্তে থাকেন, তামিম তখনই কেবল নামবেন। ননস্ট্রাইকিং প্রান্তে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। ৬ বলের প্রতিটা মুশফিক মেরে খেলার চেষ্টা করবেন, দৌড়ে কোনো রান নেবেন না। তামিমের জন্য যে দৌড়ানোও হতে পারে বিপদের! কিন্তু সব তো পরিকল্পনামতো নাও হতে পারে। যদি তামিমকে স্ট্রাইকিং প্রান্তে যেতেই হয়? মাশরাফি তাই সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। পরিকল্পনায় তখন কিছুটা রক্ষণাত্মক চিন্তা, ‘ঝুঁকি নেওয়ার দরকার নেই। মুশফিক যদি স্ট্রাইকে থাকে, আর তুই ননস্ট্রাইকে থাকিস, তাহলেই তুই যাস।’

দশম ব্যাটসম্যান রুবেল হোসেন সাজঘরে ফিরে আসছেন দেখে তামিমই মনস্থির করে ফেলেন, ‘আমি প্যাড পরতে শুরু করলাম। মুমিনুল প্যাড করতে সাহায্য করল। মাশরাফি ভাই এসে আমার গ্লাভস কেটে আঙুল বের করে দিতে সাহায্য করলেন (দুই আঙুলে মোটা ব্যান্ডেজ ছিল)। জীবনে প্রথমবার অন্য কেউ আমার অ্যাবডোমেন গার্ড পরিয়ে দিল। সবাই সাহায্য করছিল আমাকে।’

এবার এশিয়া কাপ খেলতে এসেছিলেন অনেক নাটকের পর। ভিসা জটিলতায় ভুগেছেন বারবার। প্রথম ম্যাচের আগে যাও-বা ভিসা পেলেন, তাতেও ছিল কিছু ভুল। তাতে নেই বাবার নাম। পাসপোর্ট নম্বরও দেওয়া পুরোনোটির। সেই ভুল ভিসা আর ডান হাতে চোট নিয়ে খেলতে এসেছিলেন তামিম। এসেই চোট পেলেন অন্য হাতে। এশিয়া কাপ তো বটেই, ছিটকে গেলেন অক্টোবরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরের সিরিজটা থেকেও। ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান মোস্তাফিজ যখন আউট হয়ে ফিরে এলেন, তামিম ততক্ষণে জানেন কী করতে চলেছেন, ‌‘মাঠে নামার সময়টা যখন এল, তখনো সবাই যেন বুঝতে পারছিল না কী হতে চলেছে। কিন্তু আমি আর কিছু না ভেবে সোজা মাঠে নেমে পড়লাম। কেউ একজন বলল, আমি কি সব ভেবেচিন্তেই নামছি? বললাম, আমি নিশ্চিত। তখন মনে হচ্ছিল, আমার ভাগ্যে যদি এবারের এশিয়া কাপে আর একটি বল খেলাই থাকে, তবে তা-ই হোক। একটা বলই কেন নয়? তখন মনে হয়েছিল, আমার কারণে যদি ১০টা রানও যোগ হয়, এটাও অনেক। কেউ ভাবেনি আমি ওই একটা বলই খেলতে পারব, আর শেষে ৩২ রান যোগ হবে। মুশফিক যেভাবে ব্যাট করল, সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

শ্রীলঙ্কান খেলোয়াড়রাও ভাবেনি তামিম নেমে পড়বেন। বাংলাদেশের রান তখন ২২৯। লক্ষ্যটা মামুলি বলে লঙ্কানদের মধ্যে তৃপ্তির ছাপ। কিন্তু মোস্তাফিজ আউট হওয়ার পরও মুশফিক ক্রিজে থেকে যাচ্ছেন দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগল। আর সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে ড্রেসিংরুমের প্যাসেজ থেকে উঁকি দিলেন তামিম ইকবাল! তামিমকে দেখে গর্জে উঠল পুরো গ্যালারি। ওভারের তখনো একটা বল বাকি। তামিমকে মাঠে নেমেই আবার সামলাতে হবে বল। সেটিও সুরঙ্গা লাকমলের ডেলিভারি। যে লাকমলের বলেই আঘাতেই হাতে একাধিক জায়গা ভেঙেছে।

তামিমকে বল করতে ছুটে এলেন লাকমল। খ্যাপা ষাঁড়ের মতো। শর্ট পিচ বলই করলেন, কোনো ছাড় নেই! তামিম এক হাতে ব্যাট ধরে, কিছুটা ব্যাট ফুটে গিয়ে ঠেকালেন বলটা। আরও একবার গর্জে উঠল গ্যালারি। ভাষ্যকারদের কণ্ঠেও তখন আবেগের ছোঁয়া। সেই মুহূর্তটার কথা বললেন তামিম, ‘লাকমল যখন দৌড়ে আসছিল, সেই সময়টা ভেতরে-ভেতরে খুব সাহস পাচ্ছিলাম। গ্যালারির চিৎকার শুনে আমিও বেশ রোমাঞ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। জীবনে তো এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। ওই বলে আমি আউট হয়ে যেতে পারতাম বা অন্য কোনো কিছু হতে পারত। কিন্তু ওই সময় আমার মাথায় এসব কিছুই কাজ করেনি। আমার কেবল মনে হচ্ছিল দল আর দেশের কথা।’

৪ বলে অপরাজিত ২, তামিম ইকবাল খেলে ফেলছেন জীবনের সেরা ইনিংস!